১
হঠাৎ করেই মিলির ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। এমনিতে তার ঘুম খুব ভারি, সহজে ভাঙ্গতে চায় না। কিন্তু বেশ কিছুদিন হল ঠিক রাত ৩ টায় তার ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা স্বাভাবিক মনে হলেও এখন মিলি মোটামুটি আতঙ্কে আছে। কারণটাও বেশ অদ্ভুত। ঠিক ৩ টায় যখন তার ঘুম ভাঙে, তার সাথে সাথেই কারেন্ট চলে যায়। এটা নিয়েও মিলি চিন্তা করত না যদি না গতকাল রাতে তার বারান্দায় সে একটা মানুষের হাসির শব্দ না শুনত। মিলে অনেক কষ্টে বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু আশ্চর্য সে কিছুতেই বিছানা থেকে উঠে বসতে পারছে না! কেউ যেন শক্ত দড়ি দিয়ে তার হাত-পা বেধে রেখেছে। মিলির প্রচণ্ড ভয় করছে। ইচ্ছে করছে একটা চিৎকার মেরে বলে আমাকে বাঁচাও, আমাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু সে কিছুই বলতে পারে না। হঠাৎ করেই তার বড্ড অসহায় লাগে, বড্ড বেশী অসহায়। আর ঠিক তখনই সে গতরাতের মত হাসিটা আবার শুনতে পেল। মিলির ভয়টা বেশীক্ষণ স্থায়ী হল না, কারণ তখনই সে অজ্ঞান হয়ে গেল।
সকাল ১০ টা বেজে ১৩ মিনিট। রাশেদ বসে আছে ভার্সিটির ক্যান্টিনে। মিলির সাথে আজ তার দেখা হবার কথা ঠিক ৯ টায়, কিন্তু সে এখনো আসছে না। গতকালও তার সাথে কোনো যোগাযোগ হয়নি রাশেদের। রাশেদ অনেকবার মিলিকে ফোন দিয়েছে। প্রতিবারই রিং পড়তে পড়তে ফোনটা কেটে গেছে। রাশেদের খুব অস্থির লাগছে। আরেক কাপ চা খাবে কি না সে বুঝতে পারছে না। এরই মাঝে ৫ কাপ খাওয়া হয়ে গেছে! অস্থির লাগলেই রাশেদ চা খায়। আগে সিগারেট খেত, কিন্তু মিলির সাথে রিলেশন হবার পর থেকে সে সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। মিলি সিগারেট একদম সহ্য করতে পারে না। মিলির কথা ভাবতে ভাবতে রাশেদ একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল, না হয় সে দেখতে পেত একজন অসম্ভব রোগা মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
‘ভাইজান আফনের চা।’, জলিল বলল। ক্যান্টিনের সবচেয়ে করিৎকর্মা ছেলে এই জলিল। হালের নায়ক অনন্ত জলিলের সাথে নামের মিল থাকায় সে ইদানিং একটু ভাবে থাকে।
‘চা! আমি কি তোকে চা দিতে বলেছি?’, রাশেদ খানিকটা অবাক হয়েই বলল।
‘না ভাইজান, আফনে কন নাই, আমি নিজ থেক্কাই আনসি।’ কথাটা বলেই জলিল ফিক করে হেসে দিল। যেন সে একটা মহাবুদ্ধিমানের কাজ করে ফেলছে।
রাশেদ কিছু না বলে চা টা হাতে নিল। চা’তে চুমুক দিয়েই মুখ থেকে নামিয়ে রাখল। এমন বিস্বাদ চা সে কখনো খেয়েছে বলে মনে পরছে না।
রাশেদ উঠে পড়ল ক্যান্টিন থেকে। চা এর বিলটা দিয়েই সে হাঁটা শুরু করল মিলির ক্লাসের দিকে। হয়ত সে কোন গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস এ আটকা পড়েছে। না হয় এতবার ফোন পেয়ে সে একটা কল-ব্যাক তো অবশ্যই করতো। রাশেদ মিলির ক্লাসে এসে কাউকে পেল না, ক্লাস একদম ফাঁকা। রাশেদের অস্থিরতা এখন মোটামুটি মন খারাপে রূপ নিলো। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না মিলি কেন আসলো না আজ। কাল রাতে এতো করে বললাম তাও সে আসলো না! রাশেদের মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। একটা সিগারেট খেলে ভালো হতো। কিন্তু সে খেল না, মিলি জানতে পারলে রাগ করবে। সে এখনো জানে না একটা অসম্ভব রোগা লোক তার পিছু পিছু হাঁটছে...
২
মিলির ঘুম ভাঙল সকাল ১১ টায়। তাকে কেউ জাগায় নি। আগে হলে সে এতক্ষণ ঘুমাতে পারত না, মা ঠিকই ডেকে তুলতেন। এখন আর কেউ ডেকে তুলবে না, তিন মাস আগে তার মা একটা রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে।
মিলির মাথাটা কেমন জানি ব্যাথায় চিনচিন করছে। রাতের ভয়টা তার কেটে গেছে। খুব পানি খেতে ইচ্ছে করছে, অশান্তকে ডেকে বললে এখনই পানি নিয়ে ছুটতে ছুটতে আসবে। কিন্তু সে ডাকল না। তার কিছুই ভালো লাগছে না।
মিলির হঠাৎ মনে পড়ল রাশেদকে সে আসতে বলেছিল সকালে। ফোনটা হাতে নিয়েই সে রাশেদের অনেকগুলো মিসড কল দেখতে পেল। কল ব্যাক করতে গিয়েও সে কেন জানি করল না। কি হয় একদিন কাউকে অপেক্ষা করালে? তার কিছুই ভালো লাগছে না...
অশান্তের পরিচয়টা দেয়া যাক। অশান্ত মিলিদের বাসার কাজের ছেলে। বয়স ১৩ বছর। অসম্ভব গোয়ার টাইপের ছেলে। ওর আসল নাম শান্ত। মিলির বাবাই শান্তর নাম পালটে অশান্ত করে দিয়েছে। এই নামকরণের পিছনে কিন্তু কোন ইতিহাস নাই। মিলির বাবা শমসের হোসেন একটু খামখেয়ালি টাইপের মানুষ। তার হঠাৎ মনে হল এই ছেলের নাম তো শান্ত না হয়ে অশান্ত হলেই ভালো মানায়, ব্যাস, কেল্লা ফতে। সেই মুহূর্ত থেকেই শান্তর নাম অশান্ত হয়ে গেল।
জাহেদুল কবির। বয়স আনুমানিক ৪৫ বছর। ভালো টাইপ করেন (বাংলা ও ইংরেজি দুটোই)। একটানা ১৩ ঘণ্টা টাইপ করার রেকর্ড আছে তার। কবির সাহেবকে দেখলে কেউই এই কথা বিশ্বাস করে না। এই অবিশ্বাসের কারণটা অবশ্য তাকে দেখলেই বুঝা যায়। অত্যন্ত রোগা-পাতলা গড়নের মানুষ তিনি, তার পক্ষে যে ১৩ ঘণ্টা টানা কাজ করে যাওয়া সম্ভব সেটা রীতমতো বিস্ময়কর। মানুষকে বিশ্বাস করানোর জন্যই হোক বা অন্য কোনো কারনেই হোক তার দোকানের একপাশের দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে তার কর্মরত অবস্থার একটা বিশাল ছবি।
(পাঠক হয়ত ভাবছেন এই কবির সাহেবটা আবার কে! আমি বলে দিচ্ছি। অবশ্য আমি না বললে কে ই বা বলবে! আপানারাতো শুধু পরে যাবেন... হা হা হা...)
যেই রোগা লোকটা রাশেদকে অনুসরণ করছিল তিনিই হচ্ছেন কবির সাহেব। কবির সাহেবের সাথে রাশেদের পরিচয় নেই। কিন্তু তাকে সে অনুসরণ করছে অন্য একটা কারণে। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি একটা স্বপ্ন দেখেছেন। একবার দুইবার নয়, প্রায় রাতেই তিনি একই স্বপ্ন দেখছেন! ঠিক রাত ৩ টায়। কোনদিন ১ সেকেন্ডের নড়চড় হয়নি। একই স্বপ্ন। স্বপ্নটাও ভয়াবহ।
স্বপ্নটা অনেকটা এরকমঃ আবছা অন্ধকার একটা ঘর। ঘরের ঠিক মাঝখানটায় একটা খাট। খাটের মাঝে ঘুমিয়ে আছে অসম্ভব রূপবতী এক তরুণী। প্রথম দেখাতেই যার জন্য হৃদস্পন্দন থেমে যায়, অনেকটা সেরকম রূপবতী। কবির সাহেব নিজেকেও দেখতে পান সপ্নের মাঝে। রুমের কোথাও তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছেন, কিন্তু ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে তা বোঝা যাচ্ছে না। অনেকটা যেন ভেসে থাকার মত অনুভূতি। তিনি দেখলেন, মেয়েটার শোবার ঘরের পাশে লাগানো বারান্দায় একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা ছুরি। অনেক ধারালো, অন্ধকারেও কেমন জানি জ্বলজ্বল করছে। লোকটার ছায়া পরছে মেয়েটার জানালার পর্দায়। আবছা আলোয় একবার মনে হয় মেয়েটা জেগে আছে। কিন্তু সে তো নড়াচড়া করছে না? লোকটা হঠাৎ হেসে উঠল, রক্ত শীতল করা সে হাসি। সেই হাসি শুনে কবির সাহেবের গায়ে কাটা দিয়ে উঠে, কিন্তু মেয়েটা আগের মতই ভাবলেশহীন। লোকটা আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে মেয়েটার দিকে। তার হাতের ধারলো ছুরি আরো ধারালো মনে হতে লাগলো। মেয়েটা জেগে আছে কি? কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না। তার হঠাৎ বলতে ইচ্ছে করে এই মেয়ে তুমি পালাও, তোমার অনেক বিপদ। তিনি কিছু বলতে পারেন না। তিনি লোকটাকে বাধা দেবার চেষ্টা করবেন কি? না, তিনি তাও করতে পারছেন না। তার পা যেন হঠাৎ মাটিতে গেঁথে গেছে। লোকটা তার ধারালো ছুরিটা ঠিক মেয়েটার চোখের উপর ধরল। তাহলে কি লোকটা মেয়েটার চোখ উপড়ে ফেলবে? তিনি আর ভাবতে পারেন না, ছুটে যেতে চান মেয়েটাকে বাচানোর জন্য...... আর ঠিক তখনই কবির সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে যায়...
৩
কাজের চাপে কবির সাহেব স্বপ্নটা নিয়ে আর মাথা ঘামালেন না। কিন্তু সেদিন যা ঘটলো তার কোন ব্যাখ্যা তিনি দাড় করাতে পারলেন না।
কবির সাহেব সকালে জর্দা দিয়ে পান খান, না খেলে কাজে মন বসাতে পারেন না। যথারীতি তিনি পান কিনতে পাশের দোকানে গেলেন। পান কিনে দোকানে ফিরে তিনি কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলেন। তিনি দেখলেন অসম্ভব রূপবতী এক মেয়ে তার দোকানে বসে আছে, আর সেই মেয়েটি কেউ নয়, স্বপ্নে দেখা সেই মেয়েটি। তিনি কি করবেন ঠিক বুঝতে পারলেন না। তার কিছু করতে হলো না, মেয়েটিই কথা বলল।
‘চাচা, আপনি তো খুব ভালো টাইপ করেন শুনলাম। আমার থিসিস পেপারটা একটু টাইপ করে দেবেন কালকের মধ্যে?’, মেয়েটা বলল।
কবির সাহেব কিছুই বলতে পারলেন না। কেউ যেন তার গলা চেপে ধরে আছে। তিনি মাথাটা হাল্কা কাত করে বুঝালেন যে তিনি করে দেবেন।
মেয়েটা আর কিছু বলল না, শুধু এক চিলতে হেসে একটা ফাইল দিয়ে চলে গেল।
কবির সাহেব কিছুক্ষণ বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ফাইলটা নিয়ে টাইপ করতে বসে গেলেন। তার কেন জানি মনে হতে থাকে তিনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছেন, যে কোন মুহূর্তে তার ঘুম ভাঙবে, আর এই স্বপ্নটাও ভেঙ্গে যাবে।
এসবের কিছুই হল না। কবির সাহেব মন্ত্রমুগ্ধের মত একটানা টাইপ করে গেলেন। কাজ শেষ করে তিনি দোকান বন্ধ করে দিলেন। শরীরটা তার ভালো লাগছে না। ঘুমানো দরকার। রাতে এমনিতেই ভালো ঘুম হয় না।
৪
কবির সাহেব যথারীতি পরদিন দোকান খুললেন, জর্দা দিয়ে পান খেলেন। গত রাতে ভালো ঘুম হয়েছে, তাই তার মনটাও ভালো। কিছুক্ষণের মাঝেই তার কাজের চাপ বেড়ে যাবে, তার আগেই আরেকটা পান খেলে মন্দ হয় না। আরেকটা পান খেতে তিনি দোকান থেকে বের হলেন।
পান কিনে দোকানে এসেই তিনি মিলিকে দেখলেন। তার খানিকটা অস্বস্তি লাগতে শুরু করল।
‘চাচা, আমার কাজটা কি করেছেন?’, মিলি বলল।
কবির সাহেব কিছু না বলে মিলির থিসিস পেপারটা তার দিকে এগিয়ে দিল। তার অস্বস্তিটা আরো বেড়ে গেল। মিলির ফোনটা ঠিক তখনই বেজে উঠল। মিলি ফোনটা ধরলো।
‘হ্যালো, রাশেদ, আমিতো ক্যাম্পাসেই আছি। থিসিস পেপারটা টাইপ করতে দিয়েছিলাম, ওটা নিতে এসেছি।’
ওপাশ থেকে কিছু একটা বলল, শোনা গেল না।
‘ঠিক আছে আমি অপেক্ষা করছি, তুমি আসো তাড়াতাড়ি। গেটের কাছে আসলেই দোকানটায় আমাকে দেখতে পাবে।’
ফোনটা রেখেই মিলি থিসিস পেপারটা কবির সাহেবের কাছ থেকে নিল। ‘চাচা, আমি আপনার দোকানে একটু বসি? আমার একটা বন্ধু আসছে। ও আসলেই চলে যাবো।’, মিলি বললো।
‘সমস্যা নেই, আপনি বসেন। চা খাবেন? চা দিতে বলি এক কাপ?’, কবির সাহেব বললেন।
‘না না চাচা, ধন্যবাদ। আমি এখন চা খাবো না।’, হাসিমুখে বললো মিলি।
মিনিট ১৫ পরে একটা ছেলে আসলো, ছেলেটাকে দেখেই মিলি উঠে পড়লো। কবির সাহেব পুরো ব্যাপারটি আড় চোখে লক্ষ্য করলেন। তিনি ঠিক করলেন ছেলেটাকে তিনি অনুসরণ করবেন। এই ছেলেটাই কি স্বপ্নে দেখা সেই ঘাতক! তিনি স্বপ্নে লোকটার চেহারা দেখতে পাননি একদিনও!
৫
দুইদিন হলো মিলির সাথে রাশেদের কোনো যোগাযোগ নেই। রাশেদ ঠিক করলো সে মিলির বাসায় যাবে, মিলির কোনো বিপদ হলো না তো! মিলি তো কখনোই এত দীর্ঘ সময় তার সাথে যোগাযোগ না করে থাকে না!
রাত প্রায় ৯ টা বাজে। এখন রওনা দিলেও ঘণ্টা খানেক লেগে যাবে মিলির বাসায় পৌঁছুতে। রাতের খাবারটা খেয়ে নিলে ভালো হতো। কিন্তু দেরি হবে ভেবে রাশেদ খাবার না খেয়েই রওনা দিলো মিলির বাসার দিকে। তার পিছনে পিছনে কবির সাহেবও ছিলেন। ভার্সিটি থেকেই কবির সাহেব তার পিছু পিছু এতদূর এসেছিলেন। রাশেদের সাথে একই বাসে করে তিনিও রওনা দিলেন, রাশেদ কোথায় যাচ্ছে সেটা জানার কৌতুহল তিনি কিছুতেই দমাতে পারছেন না।
বাস পান্থপথের কাছে আসতেই রাশেদ বাস থেকে নামলো। সঙ্গে কবির সাহেবও। রাশেদ আরো কয়েকবার মিলিকে ফোন দিলো, এখন আর মিলির মোবাইলে ফোন ঢুকছে না, খুব সম্ভবত মোবাইলটা বন্ধ! ধানমন্ডি ৮ নম্বর রোডের কাছাকাছি এসে পড়েছে সে হাঁটতে হাঁটতে। ৭ নম্বর রোডেই মিলির বাসা। সে এর আগে কখনো মিলির বাসায় যায় নি, কিন্তু বেশ কয়েকবার ভার্সিটি থেকে ফেরার সময় মিলিকে তার বাসার সামনে পর্যন্ত দিয়ে গিয়েছে।
কবির সাহেবের খুব কষ্ট হচ্ছে রাশেদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে। রাশেদ খুব দ্রুত হাঁটে। কবির সাহেবের নিজের উপরই বিরক্ত লাগা শুরু হলো। কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে তার এতদূর আসা উচিত হয় নি। আর এই ছেলেটাকে সে স্বপ্নেও দেখে নি খুব সম্ভবত। এতদূর এসে ফিরে যাওয়াও যায় না।
৬
শমসের সাহেব কয়েকদিন ধরে খুব অস্থিরতা বোধ করছেন। তার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি খুব একটা ভালো নেই। মাঝে মাঝেই মনে হয় তিনি আর তার মাঝে নেই। মিলির জন্য তার খুব কষ্ট লাগে, মেয়েটা খুব একা হয়ে গেছে মা কে হারিয়ে। ওর একাকীত্ব কাটানোর একটা রাস্তা তিনি ঠিকই বের করবেন!
হঠাৎ কলিং বেলের শব্দে তার চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটলো। বেশ কয়েকবার কলিং বেলটা বেজে উঠলো। অশান্ত দরজাটা খুলছে না কেনো তিনি বুঝতে পারলেন না। তার হঠাৎ মনে পড়লো অশান্ত তো বাসায় নেই, সে তার গ্রামের বাড়ী গেছে, তার মা অসুস্থ। তিনি আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজাটা খুলে তিনি একজন ডেলিভারী ম্যানকে দেখতে পেলেন, সপ্তাহের বাজার নিয়ে এসেছে, তিনিই অর্ডার করেছিলেন। বাজারগুলো নিয়ে তিনি রান্না ঘরে রেখে আসলেন। বাজারের বাইরেও একটা জিনিস তিনি অর্ডার করেছিলেন, একটি ধারালো ছুরি! ছুরিটা ব্যাগ থেকে বের করে তিনি তার শোবার ঘরের আলমারিতে রাখলেন। বাসায় বেশ কয়েকটা ছুরি আছে, কিন্তু সবগুলো তেমন ধারালো না, ছুরির ধার থাকাটা অত্যন্ত জরুরী!
রাত ১০ টার দিকে মিলি সহ রাতের খাবার খেতে বসলেন শমসের সাহেব। অন্যদিন খাবার সময় মিলিত সাথে টুকটাক কথাবার্তা বললেও আজ তিনি একদম চুপচাপ ছিলেন। মিলিও কিছু বলল না। খাবার শেষে শমসের সাহেব তার রুমে চলে আসলেন। তার খুব অস্থির লাগছে। বার বার তার স্ত্রীর এক্সিডেন্ট এর কথাটা মাথায় আসছে।
শমসের সাহেব আলমারি থেকে নতুন কেনা ছুরিটা বের করলেন। একটা বড় টাওয়েলের মাঝে ছুরিটা ঢেকে তিনি মিলির রুমের দিকে গেলেন।
বাবাকে দেখে মিলি একটু অবাক হলো, সচরাচর বাবা তার রুমে আসেন না।
‘বাবা, কিছু বলবে? আমাকেই ডাকতে, আমি আসতাম।’, মিলি বললো।
‘মা, তোকে আজ আমি একটা কথা বলবো। কথাটা আমি কাউকে না বলে শান্তি পাচ্ছি না। কাউকে না কাউকে কথাটা বলা প্রয়োজন, আমার নিজের মনের শান্তির জন্য হলেও।’, শমসের সাহেব বললেন।
‘তোর মা কে আমি অনেক ভালবাসতাম। কিন্তু আমার মনে হতো তোর মা আমাকে ঠিক আমার মত করে ভালোবাসে না। সেদিন নরসিংদী থেকে আমি আর তোর মা বাসায় ফিরছিলাম। ফেরার পথে গাড়িতে শুধু আমি আর তোর মা ছিলো। আমরা টুকটাক কথা বলছিলাম। কিছু বিষয়ে খুব কথা কাটাকাটি হচ্ছিলো আমাদের। আমার খুব মেজাজ খারাপ হয়ে পড়েছিলো, আমি কোনোভাবেই আমার মেজাজ কন্ট্রোল করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিলো মরে গেলেই ভালো হয়। হঠাৎ কি হলো জানি না, আমি সামনে থেকে আসা একটা বাসের সাথে আমাদের গাড়িটা লাগিয়ে দিলাম। আমার আর কিছু মনে নেই তারপর। জ্ঞান ফিরে নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিস্কার করলাম। কিন্তু দেখ, যে আমি মরতে চেয়েছিলাম সে বেঁচে আছি, কিন্তু তোর মা এক্সিডেন্টে মারা গেল! আমার এই বেঁচে থাকাটা আমার জন্য খুব কষ্টের হয়ে পড়েছে রে। আমিতো মরতেই চেয়েছিলাম!’, শমসের সাহেব এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললেন।
তিনি ঘামছেন। প্রচণ্ড রকম ঘামছেন।
‘বাবা! তুমি কি বলছো এসব! তুমি তো আমার মা কে খুন করেছ, এটা কোনো এক্সিডেন্ট না! আমার মা কে তুমি এভাবে মেরে ফেললে বাবা! আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না! আমি এখনই পুলিশকে ফোন করছি।’, মিলি চিৎকার করে উঠলো।
পুলিশ শব্দটা কানে যেতেই শমসের সাহেব হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। এমন কিছু হবে তিনি মনে মনে ভেবে রেখেছিলেন। হাতে রাখা টাওয়েলের ভেতর থেকে ছুরিটা বের করলেন শমসের সাহেব, মিলি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার গলায় ছুরিটা চালিয়ে দিলেন! তার নিজ হাতে দ্বিতীয় খুনটা তিনি করে ফেললেন! শমসের সাহেব মিলির নিথর দেহটা বিছানায় শুইয়ে দিলেন সুন্দরভাবে। তার আদরের মেয়েটাকে চিরদিনের জন্য ঘুম পারিয়ে দিয়ে তিনি মেঝেতে বসে পড়লেন। দরদর করে ঘামছেন তিনি।
হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ কানে এলো তার। এ সময় কেউ আসার কথা না! শমসের সাহেব আর নিতে পারছেন না, তিনি কি করবেন এখন! মিলির রক্ত মাখা ছুরিটা এখনো তার হাতে! তার পরম স্নেহের মিলিকে তিনি নিজ হাতে খুন করেছেন! শমসের সাহেব ছুরিটা হঠাৎ তার নিজের বুকে চালিয়ে দিলেন, একটা চিৎকার কি বের হলো তার গলা দিয়ে?
৭
মিলির বাসাটা ৩য় তলায়। রাশেদ খুব দ্বিধান্বিত মনে মিলির বাসার কলিং বেলে চাপ দিল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়েও রাশেদ ভেতরে কলিং বেল বেজে ওঠার সাউন্ড শুনতে পেল। কেউ দরজা খুলছে না। রাশেদ আবার কলিং বেলটা চাপতে যাবে এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে সে একটা চিৎকার শুনতে পেল। সে আবার কলিং বেলে চাপ দিলো, দরজা খুললো না কেউ। দরজার হাতলটা ধরে রাশেদ নাড়া দিতেই দরজাটা খুলে গেলো, দরজাটা খোলাই ছিলো! রাশেদ দ্রুত ঘরের মাঝে ঢুকলো। ড্রয়িং রুমটা ফাঁকা, কেউ নেই। সে মিলির কাছ থেকে অনেকবার তার বাসার বর্ণনা শুনেছে, দক্ষিণ পাশের রুমটা মিলির। সে হন্তদন্ত হয়ে মিলির রুমের দিকে গেলো। রুমের দরজাটা খোলা। রুমে ঢুকেই রাশেদ একটা বিশাল ধাক্কা খেলো। বিছানায় মিলির রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে, খুব সম্ভবত সে আর বেঁচে নেই! মেঝেতে পড়ে আছে মিলির বাবার রক্তাক্ত দেহ! মিলির বাবার বুকে একটা ছুরি গেঁথে আছে। কি করবে সে কিছুই বুঝতে পারছিলো না। রাশেদ ছুরিটা হাত দিয়ে টেনে তুললো। এমন সময় রুমের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলো! রাশেদ হাত থেকে ছুরিটা ছুড়ে ফেলে দরজার দিকে ছুটে গেলো। দরজা কেউ বাইরে থেকে লক করে দিয়েছে!
কবির সাহেব রাশেদের পিছন পিছন এসে দেখলো রাশেদ একটা পাঁচ তলা বিল্ডিংয়ের ভেতর ঢুকছে। কবির সাহেবও বিল্ডিংয়ে ঢুকলেন। রাশেদের অনেকটা পেছনে ছিলেন তিনি।
হঠাৎ বাড়ির ভিতর থেকে একটা চিৎকার শুনলেন তিনি। তিনি দ্রুত উপরে উঠতে থাকলেন। ৩য় তলায় উঠে তিনি দেখলেন একটা বাসার দরজা খোলা। তিনি অনুমান করছেন রাশেদ খুব সম্ভবত এই বাসায় ঢুকেছে। তিনি খুব সাবধানে বাসায় ঢুকলেন। বাসার দক্ষিণ পাশের একটা রুম থেকে হালকা শব্দ আসছে। কবির সাহেব সেদিকে এগিয়ে গেলেন।
দরজায় পৌঁছে তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন! তিনি দেখলেন মিলির নীথর রক্তাক্ত দেহ বিছানায় পড়ে আছে। মেঝেতে এক বয়স্ক লোকের বুক থেকে রাশেদ ছুরি টেনে তুলছে। নিশ্চয়ই রাশেদ এই দুইজনকে খুন করেছে! রাশেদকে কোনোভাবেই পালাতে দেয়া যাবে না। কবির সাহেব দ্রুত দরজাটা টেনে বাইরে থেকে লক করে দিলেন।
এখন খুব দ্রুত কয়েকটা কাজ করতে হবে তাকে। মিলির বাসার ফোন থেকে থানায় একটা ফোন করে কবির সাহেব দ্রুত বের হয়ে পড়লেন। তার সমস্ত শরীর কাপছে। মনে হচ্ছে যে কোনো সময় মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন। পাশ থেকে একটা খালি সিএনজি চলে গেলো। ডাকতে গিয়েও তিনি ডাকলেন না। এই মুহূর্তে সিএনজিতে ওঠা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। পান্থপথের মোড়ে এসে তিনি বাসে উঠে পড়লেন। এখন তার বাসায় যেতে হবে, যত দ্রুত সম্ভব।
পুলিশ এসে রাশেদকে গ্রেপ্তার করলো। রাশেদ অনেকবার বলার পরও কেউ বিশ্বাস করলো না যে সে খুন করে নি। ছুরিতে রাশেদের হাতের ছাপ খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। পুলিশকে ফোনটা কে করেছে তা বের করা যায় নি।
পরের দিন পত্রিকায় নিউজটা এলো। হেডলাইনঃ প্রেমিকের হাতে প্রেমিকা ও তার বাবা খুন! কবির সাহেব নিউজটা দেখে কিছুটা আতঙ্কিত বোধ করছেন। ফোনটা কে করেছে পুলিশ সে বিষয়ে তদন্ত করছে।
কবির সাহেব আজ রাতে স্বপ্নটা আবার দেখলেন। কিন্তু আজ স্বপ্নটা অন্যদিনের চেয়ে ভিন্ন। ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটার দিকে ছুরি হাতে এগিয়ে আসা লোকটার চেহারা আজ সে দেখতে পেল! লোকটা আর কেউ নয়, মিলির বাবা!
সমাপ্ত